Header Ads

ফেসবুক ভাবনা

ফেসবুক স্ক্রলিং প্রতিমুহূর্তে আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ? নিজেদের থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে সরে যাচ্ছি আমরা প্রতি মুহুর্তে। অন্যদের দেওয়া পোষ্ট আর পিক দেখতে দেখতে আমরা আর নিজেদেরই দেখার টাইম পায় না।অথচ কি আজব, আমরা জানিওনা যে আমরা এত পরিমান অন্যদের দেখি তুলনায় নিজেরা আমরা নিজেদেরও এত সময় ধরে কখনো দেখি না। দিন নেই রাত নেই আমরা একের পর এক অন্যদের পোষ্ট দেখছি ও নিজেরা অমুলক পোষ্ট আপলোড করছি অথচ দিন শেষে তার কোন ফাইদা নেই।ব্যস্ততা আর কাজের চাপে হয়তো বাবা মা বা আপন মানুষ গুলোকে প্রতিদিন ফোন দেওয়া হয়ে ওঠে না কিন্তু শত ব্যস্ততার মাঝেও ফেসবুকিং আমাদের মিস হয়না একটা দিনের জন্যও। বন্ধুদের স্ট্যাটাস দেখে আমরা জানতে পারি কার কবে জ্বর হলো,কার রাতে ঘুম হয় না,কার মাথা ব্যথা অথচ সময় করে যোগাযোগের অভাবে জানা ই হয়না যে প্রচন্ড মাইগ্রেনের ব্যথা আর জ্বর নিয়ে মা যে আমার তিনদিন তিনরাত ঠিকমত ঘুমাতেই পারে না।
ফেসবুকের এই অপরিকল্পিত ব্যবহার আমাদের বিবেক এবং সময় দুটিই ধ্বংস করছে প্রতিনিয়ত। লিমিটেড একটা টাইম আমাদের জীবনে অথচ তার কি আনলিমিটেড অপব্যবহার করছি আমরা প্রতিদিন। খুব নরমাল একটা লজিক দেখায়, আমরা প্রতি দিন যদি ২০ মিনিট টাইমও কিছু অপ্রয়োজনীও পোষ্ট, পিক দেখে ও নিজেরা আপলোড দিয়ে কাটায় তাহলে মাসে আমরা ১০ ঘণ্টা সময় এটার পিছনে দিচ্ছি, বসরে আসে ৫ দিন। এখন চিন্তা করি যে আমরা যদি জীবনে গড়ে ৪০ বসর এভাবে কাটায় তাহলে আসে ২০০ দিন। মানে সাড়ে ৬ মাস। সারা জীবনের হিসাব করলে এটা খুব কম লাগে তাই না? কিন্তু মাথায় রাখতে হবে যে একটানা সাড়ে ছয় মাস একটা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকাটা আসলে কতটা ভয়াবহ। এখন প্রথমে যদি ফিরে যায় তাহলে দেখব যে আমি মাত্র ২০ মিনিট এর কথা বলেছি এখন এই ২০ মিনিট কে যার যার প্রতিদিনের স্ক্রলিং টাইম অনুযায়ী ক্যালকুলেশন করে দেখি যে কত সময় আমরা আমদের এই লিমিটেড সময় থেকে স্পোয়েল করছি প্রতিদিন শুধুমাত্র সামান্য একটা কয়েকশ এমবি এর অ্যাপস এর কারনে। সাধারনত আমরা প্রতিদিন গড়ে ১ ঘন্টার উপর ফেসবুকে কাটায় (কারো কারো আরো বেশি)। সে হিসাবে আমাদের জীবন থেকে ফেসবুক কেড়ে নিচ্ছে প্রায় ২ বছর!!!
আমি যে ফেসবুকের বিরোধিত করছি ব্যাপার টা এমন নয়। আমি মূলত ফেসবুক ব্যবহারের কিছু ধরনের বিরোধীতা করছি। ফেসবুক ব্যবহারের উপর কিছুদিন আগে প্রথম আলোতে আইমান সাদিক ভাই এর লেখাটা খুবই সময়োপুযোগী ছিল । ব্যাক্তিগত ভাবে আমি মনে করি যে আমাদের সবার ফেসবুকের ফ্রেন্ড লিস্টটা একটা নাড়া দেওয়া উচিত। যারা আমাদের ফ্রেন্ড লিষ্টে আছে তাদের পিছনেই মূলত আমরা আমাদের মূল্যবান সময়টা ব্যয় করি। তাদের করা পোষ্ট,লাইক,শেয়ার এগুলো ই কিন্তু আমাদের স্ক্রলিংটা চালু রাখে। যদি এমন হয় যে একটা মানুষ যে প্রতিদিন ৫/৬টা নিজের ছবি আপলোড দেয় এবং 'হাই ফ্রান্স, আজ আমার মনটা খুব খারাপ'.... 'মিস ইউ ফ্রেন্ডস'.....'আজ নিজ হাতে রান্না করলাম'...... 'বিপদে বন্ধুর পরিচয়'...... 'তোমাকে ছাড়া আমি অর্থহীন'...ব্লা..ব্লা...ব্লা...এই টাইপের পোষ্ট করে তাহলে এই বন্ধুর কাছ থেকে আমার কি শেখার আছে?সে শুধু মাত্র আমাদের মূল্যবান টাইম টা ই কিল করছেনা আমাদের সৃষ্টিশীল চিন্তাচেতনাকে নেগেটিভলি ডাইভার্ট করছে।কিছু মানুষ আছে যারা নিজেদের সমস্যাগুলোকে জাতীয় সমস্যা মনে করে আবার কিছু লোক তো একদম বেহায়ার মত নিজের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়গুলোও পাবলিক পোস্ট করে ফেলে।আমি সব থেকে অবাক হয় যখন আমি দেখি যে কেউ তার পিতা মাতা বা কাছের খুব আপন কেউ মারা যাবার ঘন্টা খানিকের ভিতর ফেসবুকে শেয়ার করে সিমপ্যাথি ভিক্ষা করে।আমার প্রশ্ন ঐ মূহুর্তে একজন মানুষ তার মানবিকতার কোথায় অবস্থান করে?
এই মানুষগুলো আসলে ভুলের মাঝে বাস করে।আর আমরাই তাদের সাপোর্ট করে আসছি। এবং আমরাও ভুল করে যাচ্ছি।এসব পাবলিককে আনফ্রেন্ড করাটাই যুক্তিযুক্ত।
আমাদের প্রত্যেকেরই কোন না কোন বিষয়ে আগ্রহ আছে, আছে কোন না কোন স্বপ্ন। তো যদি এমন হয় যে আমাদের স্ক্রলিং এর সাথে আমাদের স্বপ্নগুলো আরও জীবন্ত হয়ে উঠছে,হাতছানি দিচ্ছে স্বপ্নের আরো কাছে যাবার। যদি এমনই হয় যে আমাদের আগ্রহের জায়গাটা পূর্ণতা পাচ্ছে ফেসবুক স্ক্রলিং এর মাধ্যমে তাহলে ব্যপারটা কতটা একসাইটিং হত তাইনা ? অথচ আমরা চাইলেই এটা পারি !
আমি চারুকলার স্টুডেন্ট। শিল্প সাহিত্য নিয়ে আমার যত স্বপ্ন।আমার ফেসবুক স্ক্রলিং এর অধিকাংশ সময় জুড়ে আমি দেখি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মাস্টার ক্লাস পেইন্টিংস। ভালো ভালো কিছু লেখা। এটা তো আর এমনি এমনি হয়নি। কিছু ভালো পেইজ ,গ্রুপে এবং এমন কিছু মানুষকে আমি এড করেছি যে তাদের মাধ্যমে আমি আমার পছন্দের জায়গাটা খুজে পাব এবং এমন কিছু মানুষকে প্রতিমূহুর্তে রিমুভ করছি যেন আমার পছন্দের বিষয়গুলো পর্যাপ্ত জায়গা পায়। রিমুভ ব্যপারটা রিসাইকেল বিনের মত কাজ করছে। তবে পঁচা শামুক যে একেবারেই নেই তা বলব না তবে পরিমানটা সময় স্বাপেক্ষে নিয়ন্ত্রনে আছে।
ভালো পেইজ,ভালো গ্রুপ,ভালো মানুষ এই তিনে মিলে আমরা আমাদের ফেসবুক আইডিটাকে খুব সহজেই একটা ইউনিভার্সিটি বানিয়ে ফেলতে পারি ! যেখানে আমরা আমাদের পছন্দের সাবজেক্ট নিয়ে পড়তে পারব। আমরা হয়ত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চাইলেই পছন্দের সাবজেক্ট নিয়ে পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে পড়তে পারিনা। কিন্তু ফেসবুক,গুগল,ইউটিউব,উইকিপিডিয়া এ চারটার স্বদ্যব্যবহার করে আমরা চাইলেই আমাদের পছন্দের সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশোনা করতে পারি।
তাহলে যেটা দাড়াচ্ছে যে ফেসবুক একটা ইউনিভার্সাল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস আর গুগল,ইউটিউব, উইকিপিডিয়া(আরো আছে) আমাদের ভার্সিটি ল্যাব।আমরা আমাদের পছন্দের বিষয়গুলোকে এসাইনমেন্ট হিসাবে সাবমিট করতে পারি(স্ট্যাটাস/পোষ্ট হিসাবে)।আমরা সবসময় চাই একটা ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়তে /ভালো জব করতে। তাহলে ফেসবুকে ও কেনো আমরা নিজেদের ভালোর দিকটা দেখব না।
(সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুক ব্যবহারের জনপ্রিয়তা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও এর ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তা করতে করতে কয়েকটি কথা লিখতে ইচ্ছা করছিল,তাই লেখাটি লেখা।কাউকে আঘাত করার কোন উদ্দেশ্য এখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে অনুপস্থিত)
মারজান কবির

No comments

Theme images by lobaaaato. Powered by Blogger.